Breaking News
Home / ধর্ম ও জীবন / অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর জীবনী ও ঘটনা

অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর জীবনী ও ঘটনা

ইসলামিক রিপোর্টার-মোঃ আবুল বাসার: হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) জীবনী ও ঘটনা রাসূল (সঃ) এর বিশিষ্ট সাহাবী, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা, খুলাফাই রাশিদুন এর অন্যতম, ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রূপকার ।

ইসলাম ধর্ম গ্রহন: হযরত (সঃ) এর নবুওয়াতের প্রথম পর্যায়ে উমার (রাঃ) ছিলেন ঘোর ইসলাম বিরোধী । মক্কার নবদীক্ষিত মুসলিমদের উপর তিনি নির্যাতন চালাইতেন । তিনি ইসলামী আন্দোলনের বিরোধিতা করিতেছিলেন বটে, কিন্তু পরোক্ষে ইসলামের প্রভাবে তাহার শুভবুদ্ধি ক্রমশ জাগরিত হইতেছিল । রাসূল (সঃ) এর অজ্ঞাতসারে একদা তাহার মুখে কুরানের আবৃত্তি শুনিয়া তাহার মনে ভাবান্তর ঘটার বর্ননা পাওয়া যায় । একদিন ভগিনী ও ভগ্নীপতিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য নির্দয়ভাবে শাসন করিতে গিয়া নিজেই তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়েন এবং রাসূল (সঃ) এর নিকট উপস্থিত হইয়া ইসলাম গ্রহণ করেন । ইসলাম গ্রহণের ফলে তাহার জীবনের আমূল পরিবর্তন হয় । পরবর্তীকালে তিনি ইসলামের সেবার অক্ষয় কীর্তি রাখিয়া যান ।

খিলাফত লাভের পূর্বে খেদমতঃ

হিজরতের চারি বৎসর পূর্বে যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাহার বয়স ছিল ছাব্বিশ বৎসর । তাহার পর হইতে তিনি পূর্ন শক্তিতে ইসলামের খিদমতে ঝাপাইয়া পড়েন । তাহার গোত্র বানু আদি ইবন্‌ কা~ব হইতে এই ব্যাপারে তিনি কোন সাহায্য পান নাই । মদিনায় তাহার ব্যক্তিগত উদ্যম এবং মনোবলের প্রভাবেই তিনি রাসূল (সঃ) এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজে মর্যাদা লাভ করেন, গোত্রীয় মর্যাদারকারণে নয় । সৈনিক হিসাবেও তাহার প্রভূত খ্যাতি ছিল । তিনি বদর, উহুদ ও অন্যান্য যুদ্ধে যোগদান করেন । হাদিছে আছে যে, কুরআনের কয়েকটি স্থানে উমার (রাঃ) এর উক্তি সমর্থনে অয়ায়হি অবতীর্ন হইয়াছিল । যথাঃ ২ঃ১২৫- কাবা গৃহের পার্শস্থ মাকাম ইব্রাহীমে সালাত আদায়; ৩৩ঃ৫৩, রাসূল (সঃ) বিবিগণের সামনে পর্দা পালন ইত্যাদি । সাহাবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বে হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হযরত উমার (রাঃ) এর অগ্রগণ্য ছিলেন । হযরত উমার (রাঃ) বিনয় সহকারে তাহা স্বীকার করিতেন এবং সর্বদা হযরত আবু বকর (রাঃ) কে যথোপযুক্ত সম্মান দেখাইতেন । তাহাদের কন্যাগণ রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র বিবি তথা উম্মতের জননী হইবার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছিলেন । রাসূল কারীম (সঃ) এর বিবি হযতর হাফসা (রঃ) হযতর উমার (রাঃ) এর কন্যা ছিলেন । রাসূল কারীম (সঃ) এর ওফাতের পর হযরত উমার (রাঃ) ই সর্বপ্রথম হযরত আবু বকর (রাঃ) এর নিকট বায়াত হন ।

খেলাফত লাভ ও শাসনকার্যঃ

হযরত আবু বকর (রাঃ) এর খিলাফাতকালে হযরত উমার (রাঃ) ই ছিলেন তাহার প্রধান উপদেষ্টা । মৃত্যুর পূর্বে তিনি উমার (রাঃ) কেই তাঁহার স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করেন, সাহাবীগণও সর্ব-সম্মতভাবে উমার (রাঃ) কে তাহাদের খলীফারুপে গ্রহণ করেন এবং এইরূপে নেতা নির্বাচনের আরবীয় প্রথানুসারে জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতেই উমার (রাঃ) তাঁহার খিলাফাত শুরু করেন । ঘরে বাহিরে উমার (রাঃ) যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হইলেন পূর্ব হইতেই তিনি ইহার সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন । মুসলিম রাষ্ট্রের পরিধি বৃদ্ধি করিবার জন্য যুদ্ধ করা তাঁহার অভিপ্রেত ছিল না । নৌ-যুদ্ধ তাঁহার দৃষ্টিতে অধিকতর অবাঞ্ছিত, কিন্তু মুসলিম শক্তিকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করিবার জন্য বদ্ধপরিকর বিরুদ্ধ শক্তিগুলির সহিত মুকাবিলায় তিনিই ছিলেন অধিনায়ক । যে সকল সেনাপতি মুসলিমদের প্রয়াসকে সাফল্যমণ্ডিত করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন তাহাদের সকলের নিয়ন্তা । এইক্ষেত্রে তাঁহার কৃতিত্ব সর্বজনবিদিত । ইসলামের স্বার্থে খালিদ (রাঃ) এর ন্যায় একজন সুদক্ষ সেনাপতিকেও তিনি পদচ্যুত করিয়াছিলেন এবং খালিদ (রাঃ)ও এই পদচ্যুতি অবনত মস্তকে মানিয়া লইয়াছিলেন । ইহা তাঁহার বলিষ্ঠ কৃতিত্বেরই পরিচায়ক । এই ঘটনা হইতে রাসুল (সঃ) এর সাহাবী (রাঃ) গনের চরিত্র বৈশিষ্ট্যেরও পরিচয় মিলে । ‘আম্‌র ইবনুল আস (রাঃ) এর মিসর বিজয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দান করিয়া তিনি খুবই দূর-দৃষ্টির পরিচয় দেন । তিনি রাসূল কারীম (সাঃ) এর বিশিষ্ট সাহাবীদিগকে সম্ভ্রমবশত সাধারণ সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ করিতেন না । কিন্তু প্রয়োজন হইলে গুরুত্বপূর্ন পদে তাহাদিগকে নিয়োগ করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না । এইরূপে ইরাক ও সিরিয়ার শাসনকর্তা হিসাবে তিনি কয়েকজনকে নিযুক্ত করেন ।

হযরত উমার (রাঃ) এর সময়েই ইসলামী রাষ্ট্রের বাস্তব ভিত্তি স্থাপিত হয় । এই সময়েই অনেকগুলি ইসলামী বিধি-ব্যবস্থা বাস্তব রূপ লাভ করে বলিয়া কথিত হয় । এইগুলির পূর্ন রুপায়ন ঐতিহাসিক বিকাশ ধারা অনুসারে ক্রমে ক্রমে সাধিত হইলেও ইহাদের সূচনা হযরত উমার (রঃ) এর সময়েই হইয়াছিল । যখনই কোন প্রশ্ন বা সমস্যার উদ্ভব হইত, তিনি সাহাবী (রাঃ) গনকে একত্র করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন সেই ব্যাপারে হযরত (সঃ) এর কোন উক্তি বা সিদ্ধান্ত আছে কিনা তাহাদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেন । কুরআন ও সুন্নাহ্‌ই ছিল তাঁহার সংবিধান এবং বিশিষ্ট সাহাবী [যথা আলী, আব্দুর রাহমান ইবন আওফ (রাঃ) প্রমুখ] গণ ছিলেন তাঁহার পরামর্শ সভার সদস্য । দীনতম নাগরিকও তাঁহার কর্মের সমালোচনা করিতে শুধু সাহসীই নহে বরং উৎসাহিতও হইতেন- ইহার বহু নজির পাওয়া যায় । তাঁহার জীবন যাপনের মান সাধারণ নাগরিকের অনুরূপ ছিল । এই বিষয়ে হযরত উমার (রাঃ) এর দৃষ্টান্ত সত্যই বিরল ।

জিম্মি (মুসলিম রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিক) গণের অধিকার সংরক্ষণ, সরকারি আয় জনগণের মধ্যে বণ্টনের জন্য দীওয়ান ব্যবস্থার প্রবর্তন, সামরিক কেন্দ্র (যথাঃ বসরা, কুফা)- সমূহ প্রতিষ্ঠা (এই সকল কেন্দ্র হইতেই উত্তরকালে কয়েকটি বৃহৎ নগরীর সৃষ্টি হয়) । এতদ্বব্যতিত ধর্মীয়, পৌর এবং দণ্ডবিধি সঙ্ক্রান্ত বিশেষ বিধিও তিনি প্রবর্তন করেন । যথাঃ তারাবীহের সালাত জামা~আতে সম্পন্ন করা, হিজরি সনের প্রবর্তন, মদ্যপানের শাস্তি ইত্যাদি ।

আবু বকর (রাঃ) খলীফা (খালীফাতু রাসুলুল্লাহ বা রাসুলের প্রতিনিধি) বলিয়া অভিহিত হইতেন । তদনুসারে উমার (রাঃ) ছিলেন রাসূলের খলীফার খলীফা । হযরত (সঃ) নেতা অর্থে সাধারনত আমীর শব্দের ব্যবহার করিতেন এবং আরবদের মধ্যে এই শব্দের ব্যবহার প্রচলিত ছিল । ১৯ হিজরিতে তিনি এই উপাধি গ্রহণ করেন । সম্ভবত তিনি নিজকে রাসূল (সঃ) এর খলীফা বা স্থলাভিষিক্ত বলা বা মনে করাকে ধৃষ্টতারুপ গণ্য করিতেন । হাদিছে বিবৃত হইয়াছে যে, রাসূল (সঃ) বলিয়াছেন, ~আমার পর কেহ নবী হইলে উমার নবী হইত । (দ্রঃ আল মুহিব্বুত-তাবারী, মানাকিবুল আশারাঃ ১খ, ১৯৯)

শাহাদতঃ

উমার (রাঃ) এর অন্তরে আল্লাহ্‌র ভয় ও ভক্তির মধ্যে দৃশ্যত ভয়ই ছিল প্রবলতর । তিনি যে সম্মান অর্জন করেন তাহা তাঁহার চরিত্রগুণের কারনে, শারীরিক শক্তির জন্য নহে । যদি আবু উবায়দা (রাঃ) জীবিত থাকিতেন তবে তাহাকেই তাঁহার স্থলাভিষিক্তরুপে মনোনীত করিতেন, তাঁহার এইরূপ ইচ্ছা প্রকাশের বিবরন পাওয়া যায় । হযরত (সঃ) এর সত্যিকারের সাহাবী এবং কুরআন ও সুন্নাহ্‌র পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসারী খলীফারুপে মর্যাদার উচ্চ শিখরে সমাসীন থাকাকালে ২৬ জুল হিজ্জাঃ ২৩/৩ নভেম্বর, ৬৪৪ সালে তিনি মুগীরাঃ ইবন শু~বা~র খ্রিষ্টান ক্রীতদাস আবু লু~লু~র ছুরিকাঘাতে শাহাদাত প্রাপ্ত হন । ইতিহাসে কথিত হইয়াছে যে, উমার (রাঃ) এর নিকট আবু লু~লু~ তাঁহার মনিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে । উমার (রাঃ) এর বিচারে অসন্তুষ্ট হইয়া সে নিহায়েত ব্যক্তিগত আক্রোশের বশে অতর্কিতভাবে তাহাকে হত্যা করে । মৃত্যুর পূর্বে উমার (রাঃ) ছয়জন বিশিষ্ট সাহাবীর নামোল্লেখ (‘উছমান এবং আলী (রাঃ) ও তাহাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন ) করিয়া পরামর্শক্রমে তাহাদের মধ্যে একজনকে খলীফা মনোনীত করার উপদেশ দিয়া যান । ইহার ফলে হযরত উছমান (রাঃ) খলীফা মনোনীত হন।

আল মুহিব্বুল তাবারীর আর-রিয়াদুন-নাদিরা ফী মানাকিবিল আশারাঃ, কায়রো ১৩২৭, পুস্তকে তাঁহার গুণাবলীর আলোচনা আছে । শী~আ সম্প্রদায় তাহাকে ভাল চক্ষে দেখে নাই; কারন তাঁহারা মনে করে, যাহাদের কারণে আলী (রাঃ) রাসূল (সঃ) এর খিলাফাতে অধিষ্ঠিত হইতে পারেন নাই, উমার (রাঃ) তাহাদের অন্যতম । সূফীগণ হযরত উমার (রাঃ) এর অনাড়ম্বর জীবন যাপন পদ্ধতির প্রশংসা করিয়াছেন।

ওমর (রা.)-কে ৪টি ঐতিহাসিক প্রশ্ন করেছিলেন এক খিৃস্টান বাদশাহঃইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) কে এক খৃষ্টান বাদশাহ চারটি প্রশ্ন লিখে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং আসমানী কিতাবের আলোকে প্রশ্নের উত্তর চেয়েছিলেন। সেই চিঠির ৪টি প্রশ্ন পরবর্তিতে ঐতিহাসিক প্রশ্ন হিসেবে সবার কাছে সমাদৃত হয়ে আছে।

১ম প্রশ্নঃ একই মায়ের পেট হতে দু’টি বাচ্চা একই দিনে একই সময় জন্ম গ্রহন করেছে এবং একই দিনে ইন্তেকাল করেছে তবে, তাদের একজন অপরজন থেকে ১০০ বছরের বড় ছিলো। তারা দুইজন কে? কিভাবে তা হয়েছে?

২য় প্রশ্নঃ পৃথিবীর কোন্ স্থানে সূর্যের আলো শুধুমাত্র একবার পড়েছে। কেয়ামত পর্যন্ত আর কখনো সূর্যের আলো সেখানে পড়বে না?

৩য় প্রশ্নঃ সে কয়েদী কে, যার কয়েদ খানায় শ্বাস নেওয়ার অনুমতি নেই আর সে শ্বাস নেওয়া ছাড়াই জীবিত থাকে?

৪র্থ প্রশ্নঃ সেটি কোন কবর, যার বাসিন্দা জীবিত ছিল এবং কবরও জীবিত ছিল, আর সে কবর তার বাসিন্দাকে নিয়ে ঘোরাফেরা করেছে এবং কবর থেকে তার বাসিন্দাজীবিত বের হয়ে দীর্ঘকাল পৃথিবীতে জীবিত ছিল?

হযরত ওমর (রাঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে ডাকলেন এবং উত্তরগুলো লিখে দিতে বললেন।

১ম উত্তরঃ দুই ভাই ছিলেন হযরত ওযায়ের (আঃ) এবং ওযায়েয (আঃ) তারা একই দিনে জন্ম এবং একই দিনে ইন্তেকাল করা সত্বেও ওযায়েয (আঃ) ওযায়ের (আঃ) থেকে ১০০ বছরের বড় হওয়ার কারন হল, মানুষকে আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর পর আবার কিভাবে জীবিত করবেন? হযরত ওযায়ের (আঃ) তা দেখতে চেয়ে ছিলেন। ফলে, আল্লাহ তাকে ১০০ বছর যাবত মৃত্যু অবস্থায় রাখেন এরপর তাঁকে জীবিত করেন। যার কারনে দুই ভাইয়ের বয়সের মাঝে ১০০ বছর ব্যবধান হয়ে যায়।

২য় উত্তরঃ হযরত মুসা (আঃ) এর মু’জিযার কারনে বাহরে কুলযুম তথা লোহিত সাগরের উপর রাস্তা হয়ে যায় আর সেখানে সূর্যের আলো পৃথিবীর ইতিহাসে একবার পড়েছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত আর পড়বে না।

৩য় উত্তরঃ যে কয়েদী শ্বাস নেওয়া ছাড়া জীবিত থাকে, সে কয়েদী হল মায়ের পেটের বাচ্চা, যে নিজ মায়ের পেটে কয়েদ (বন্দী) থাকে।

৪র্থ উত্তরঃ যে কবরের বাসিন্দা জীবিত এবং কবরও জীবিত ছিলো, সে কবরের বাসিন্দা হলেন, হযরত ইউনুস (আঃ) আর কবর হল, ইউনুস (আঃ) যে মাছের পেটে ছিলেন- সে মাছ। আর মাছটি, ইউনুস (আঃ) কে নিয়ে ঘোরাফেরা করেছে। মাছের পেট থেকে বের হয়ে আসার পর, ইউনুস (আঃ) অনেক দিন জীবিত ছিলেন। এরপর ইন্তেকাল করেন।

দুই বিখ্যাত সাহাবী আবু বকর (রা) ও উমার (রা) কথা বলছিলেনঃ

দুই বিখ্যাত সাহাবী আবু বকর (রা) ও উমার (রা) কথা বলছিলেন। হঠাৎ আবু বকরের কথায় উমার মারাত্মক রেগে গেলেন। এমনকি ওই স্থান ছেড়ে চলে গেলেন। আবু বকর (রা) খুবই লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উমারের পেছনে পেছনে ছুটতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, ‘ভাই উমার, আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’ উমার (রা) ফিরেও তাকাচ্ছেন না! এক পর্যায়ে তিনি বাড়ি চলে গেলেন, পেছনে পেছনে আবু বকরও তার ঘরের দরজায় পা রাখলেন। কিন্তু উমার (রা) আবু বকর (রা) এর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেন।

উদ্বিগ্ন আবু বকর ছুটে গেলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে। একটু পর উমারও সেখানে হাজির। আসলে দুজনই অনুতপ্ত, লজ্জিত। উমার (রা) নিজের দোষ স্বীকার করে সব বর্ণনা দিলেন, কীভাবে আবু বকরের মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। সব শুনে রাসূল (স) উমারের উপর খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। আবু বকর (রা) আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি বলতে লাগলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! ভুল আমারই হয়েছে, তার কোন ভুল নেই।’ তিনি উমার (রা) কে নির্দোষ প্রমাণ করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন।…(সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৪২৭৪)

সুবহানাল্লাহ। কী চরিত্র, কী বিনয়, কী আচরণ! সোনার মানুষ ছিলেন তাঁরা, সত্যিই সোনার মানুষ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির শিষ্যগণ তো এমনই হবেন। আমরা কত বড় দুর্ভাগা যে, তাঁদের জীবনীটা কখনো পড়ে দেখিনি, তাঁদেরকে উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার চিন্তাও করিনি। তাঁদেরকে জানুন। টপ টপ করে চোখ দিয়ে পানি পড়বে তাঁদের জীবনী পড়লে।

তাঁদের অন্তরগুলো ছিল স্ফটিকের মত স্বচ্ছ। তাঁরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই একে অপরকে ভালবাসতেন। এই পয়েন্টটিতে কেন আমরা এত পিছিয়ে? একই পথের পথিক হয়েও কেন আমাদের মধ্যে এত হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা? নিশ্চিত থাকুন, আখিরাতে এর চরম মূল্য দিতে হবে।

বিচারকের মসনদে হযরত ঊমার (রাঃ) ঃ

হযরত উমর রা.-এর দরবার। দাড়ি-মোচ হীন এক যুবকের লাশ উপস্থিত করা হলো দরবারে। নিহত যুবকের লাশ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছে পুলিশের লোকেরা। হত্যা করা হয়েছে তাকে। আমীরুল মুমিনীন পেরেশান। বহু তত্ত্ব-তালাশ ও অনুসন্ধানের পরও হত্যার কোনো ক্লু খুঁজে পেলেন না। বিষয়টি নিয়ে অনেক চিন্তিত তিনি। কোনো উপায়ন্তর না দেখে দ্বারস্ত হলেন দরবারে এলাহিতে। দোয়া করলেন, হে প্রভু! এই যুবকের হত্যা রহস্যকে তুমি আমার সামনে উদ্ঘাটন করে দাও।

এক বছর পর। যে স্থানে যুবকের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো, ঠিক সেখানেই পাওয়া গেলো একটি সদ্য ভুমিষ্ট নবজাতক। শিশুটিকে উপস্থিত করা হলো দরবারে। তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো হযরত উমরের চোখে মুখে। বললেন, ইনশাআল্লাহ এবার সে যুবকের হত্যা রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। শিশুটিকে তিনি একজন মহিলার হাতে অর্পণ করে বললেন, তুমি তাকে যত্নের সাথে লালন করবে এবং তার যাবতীয় খরচাদি আমার কাছ থেকে মাস শেষে নিয়ে যাবে। অতঃপর বললেন, শিশুটিকে লালন-পালন করার মধ্যবর্তী সময়ে লক্ষ্য রাখবে কোনো মহিলা শিশুটিকে নিতে আসে কি না। অথবা কেউ তাকে আদর সোহাগ করে চুমো দেয় কি না। যদি এমন কিছু ঘটে তাহলে সাথে সাথে আমাকে খবর দিবে এবং তার ঠিকানা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে।

কেটে গেলো কয়েক বছর। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করেছে ছেলেটি। একদিন একজন দাসী এসে মহিলাকে বললো, আমার মুনিবা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন ছেলেটিকে আমার সাথে পাঠানোর জন্য। তিনি তাকে একটু দেখতে চান। মহিলা বললো, ঠিক আছে চলো, আমিও যাবো সাথে। ছেলেটিকে নিয়ে যখন তারা সে বাড়িতে পৌঁছল তখন কৃতদাসীর মুনিবা তাকে কোলে তুলে নিলো, বুকে জড়িয়ে আদর-সোহাগ করতে লাগলো। চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো তাকে।

খবর নিয়ে জানা গেলো উক্ত মুনিবা একজন আনসারী সাহাবীর মেয়ে। এবার সেই মহিলা কালবিলম্ব না করে হযরত উমরের দরবারে উপস্থিত হয়ে ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা দিলো। হযরত উমর রা. ঘটনা শুনামাত্র তলোয়ার হাতে রওয়ানা হলেন আনসারী মহিলার বাড়িতে। পৌঁছলেন। মহিলার পিতা তখন দরজায় হেলান দিয়ে বসা ছিলেন।

হযরত উমর রা.-এর দরবার। দাড়ি-মোচ হীন এক যুবকের লাশ উপস্থিত করা হলো দরবারে। নিহত যুবকের লাশ রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছে পুলিশের লোকেরা। হত্যা করা হয়েছে তাকে। আমীরুল মুমিনীন পেরেশান। বহু তত্ত্ব-তালাশ ও অনুসন্ধানের পরও হত্যার কোনো ক্লু খুঁজে পেলেন না। বিষয়টি নিয়ে অনেক চিন্তিত তিনি। কোনো উপায়ন্তর না দেখে দ্বারস্ত হলেন দরবারে এলাহিতে। দোয়া করলেন, হে প্রভু! এই যুবকের হত্যা রহস্যকে তুমি আমার সামনে উদ্ঘাটন করে দাও।

এক বছর পর। যে স্থানে যুবকের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো, ঠিক সেখানেই পাওয়া গেলো একটি সদ্য ভুমিষ্ট নবজাতক। শিশুটিকে উপস্থিত করা হলো দরবারে। তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো হযরত উমরের চোখে মুখে। বললেন, ইনশাআল্লাহ এবার সে যুবকের হত্যা রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। শিশুটিকে তিনি একজন মহিলার হাতে অর্পণ করে বললেন, তুমি তাকে যত্নের সাথে লালন করবে এবং তার যাবতীয় খরচাদি আমার কাছ থেকে মাস শেষে নিয়ে যাবে। অতঃপর বললেন, শিশুটিকে লালন-পালন করার মধ্যবর্তী সময়ে লক্ষ্য রাখবে কোনো মহিলা শিশুটিকে নিতে আসে কি না। অথবা কেউ তাকে আদর সোহাগ করে চুমো দেয় কি না। যদি এমন কিছু ঘটে তাহলে সাথে সাথে আমাকে খবর দিবে এবং তার ঠিকানা সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে।

কেটে গেলো কয়েক বছর। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করেছে ছেলেটি। একদিন একজন দাসী এসে মহিলাকে বললো, আমার মুনিবা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন ছেলেটিকে আমার সাথে পাঠানোর জন্য। তিনি তাকে একটু দেখতে চান। মহিলা বললো, ঠিক আছে চলো, আমিও যাবো সাথে। ছেলেটিকে নিয়ে যখন তারা সে বাড়িতে পৌঁছল তখন কৃতদাসীর মুনিবা তাকে কোলে তুলে নিলো, বুকে জড়িয়ে আদর-সোহাগ করতে লাগলো। চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিলো তাকে।

খবর নিয়ে জানা গেলো উক্ত মুনিবা একজন আনসারী সাহাবীর মেয়ে। এবার সেই মহিলা কালবিলম্ব না করে হযরত উমরের দরবারে উপস্থিত হয়ে ঘটনার সবিস্তার বর্ণনা দিলো। হযরত উমর রা. ঘটনা শুনামাত্র তলোয়ার হাতে রওয়ানা হলেন আনসারী মহিলার বাড়িতে। পৌঁছলেন। মহিলার পিতা তখন দরজায় হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। হযরত উমর রা. তাকে বললেন, হে অমুক! তোমার অমুক মেয়ের হালাত কী ? মহিলার পিতা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন ! আস’আদাকাল্লাহ ! আমার মেয়ে আল্লাহর হক, মানুষের হক, পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের হক, মানুষের সাথে আচার-আচরণ, চাল-চলন, নামায-রোযা দ্বীনদারী ইত্যাদি সর্ববিষয়ে বেশ যত্নশীল।

হযরত উমর বললেন, আমি তোমার মেয়ের সাথে সাক্ষাত করতে চাই। আমি তাকে নেক কাজে আরো উৎসাহিত করবো। অতঃপর মহিলার পিতাসহ হযরত উমর মহিলার ঘরে প্রবেশ করলেন। গৃহে প্রবেশের পর হযরত উমর মহিলার পিতাকে বললেন, তুমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাও। মহিলার পিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে উমর রা. তরবারী কোষমুক্ত করে বললেন, যা ঘটেছে সব সত্য সত্য বলো, না হয় তোমার গর্দান উড়িয়ে দিবো।

মহিলা বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি শান্ত হোন। অবশ্যই আমি সত্য খুলে বলবো। এই বলে সে বলতে শুরু করলো, জনাব! আমাদের গৃহে এক বৃদ্ধা মহিলা আসা যাওয়া করতো। এক পর্যায়ে তার সাথে আমার এমন ঘনিষ্টতা হয় যে, আমি তাকে স্বীয় মায়ের মতো শ্রদ্ধা করতাম। কারণ, তিনিও আমাকে মায়ের মতো আদর-যত্ন করতো। মহব্বত করতো। এভাবে দীর্ঘদিন কেটে যায়। একদিন সে আমাকে বললো, বেটী! আমি সফরে যাওয়ার ইচ্ছে করেছি। ঘরে আমার এক মেয়ে আছে। তার ব্যাপারে খুব শংকিত। তাকে কোথায় রেখে যাবো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত করেছি তাকে তোমার নিকট রেখে যাবো। আমি সফর থেকে ফেরা পর্যন্ত সে তোমার কাছে অবস্থান করবে। একথা বলে তিনি তার ছেলেকে মেয়ের সাজে সজ্জিত করে আমার নিকট রেখে গেলেন।

তার চাল-চলন বেশ-ভূষা সবকিছু মেয়েদের মতো। সে মেয়ে হওয়ার ব্যাপারে আমার মনে সামান্যতম সন্দেহের উদয় হয়নি। সুতরাং দুইজন মেয়ে এক সাথে সাধারণতঃ যেভাবে চলা-ফেরা, উঠা-বসা করে, আমিও তার সাথে সেভাবে কাটাতে লাগলাম। এভাবে বেশ ক‘দিন অতিবাহিত হলো।

একদিন আমি ঘুমিয়ে আছি। সুযোগ বুঝে সে আমার উপর চড়ে বসে এবং আমি কিছু অনুমান করার আগেই সে আমার সতীত্ব হরণ করে নেয়। অবস্থা বুঝে উঠার পর আমার হাতের কাছে ছিলো একটা ছুরি, সেটা দিয়ে তাকে খুন করি। এরপর খাদেমাকে নির্দেশ দেই তাকে সেখানে ফেলে আসতে যেখানে আপনি তার লাশ পেয়েছিলেন। তার থেকেই আমার গর্ভে সন্তান আসে। সেই সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর তাকেও সেই স্থানে ফেলে আসার নির্দেশ দেই, যেখানে তার পিতাকে ফেলে আসা হয়েছিলো। আল্লাহর শপথ ! এই হলো সত্য ঘটনা।

হযরত উমর রা. বললেন, বেটী ! তুমি সত্য বলেছো। এরপর হযরত উমর রা. মহিলার জন্য দোয়া করে বেরিয়ে আসলেন। আসার সময় তার পিতাকে বললেন, তোমার মেয়েটা বড়োই বুদ্ধিমান ও নেককার।

খলীফা নির্বাচিত হবার পর হযরত উমর (রা.)-এর ভাষণঃ

হযরত উমর (রা.) খলীফা নির্বাচিত হবার পর জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল,

“তোমাদের ধন- সম্পদে আমার অধিকার ততটুকু, যতটুকু অধিকার স্বীকৃত হয় ইয়াতীমের সম্পদে তার অভিভাবকের জন্য। আমি যদি ধনী ও স্বচ্ছল অবস্থায় থাকি, তবে আমি কিছুই গ্রহণ করব না। আর আমি যদি দরিদ্র হয়ে পড়ি তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পদ গ্রহণ করব।

হে মানবমান্ডলী! আমার উপর তোমাদের কতগুলো অধিকার রয়েছে, আমার পক্ষ থেকে তা আদায় করা কর্তব্য। প্রথমতঃ দেশের রাজস্ব ও গনীমতের মাল, তা যেনো অহেতুক ব্যয় না হয়।

দ্বিতীয়ত, তোমাদের জীবিকার মান উন্নয়ন ও দেশের সীমান্ত রক্ষা আমার দায়িত্ব। আমার প্রতি তোমাদের এই অধিকারও রয়েছে যে, আমি তোমাদেরকে কখনো বিপদে ফেলব না।” তিনি আরও বলেছিলেন,

“তোমাদের যে কেউ আমার মধ্যে নীতি- বিচ্যুতি দেখতে পাবে, সে যেন আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে চেষ্টা করে।”

উপস্থিত শ্রোতাবৃন্দ হতে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আল্লাহর শপথ! আপনার মধ্যে আমরা কোন নীতি- বিচ্যুতি দেখতে পেলে এই তীব্রধার তরবারি দ্বারা তা ঠিক করে দেব।”

এই হলো ইসলামের শাসন ব্যবস্থা।

     হযরত ওমর (রাঃ) এবং তাঁর ওয়াদাঃ

 

   খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর সময়কার একটি ঘটনা। পারস্যের নিহাওয়ান্দ প্রদেশের শাসনকর্তা হরমুযান। পর পর অনেকগুলো যুদ্ধেমুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়বার পর এবং অগনিত মুসলমানকে নিজ হাতে হত্যা করার পর তিনি অবশেষে মুসলমানদের হাতে বন্ধী হলেন । হরমুযান ভাবলেন , খলিফা ওমর (রাঃ) নিশ্চয়ই তার প্রানদন্ডের হুকুম দেবেন, না হয় অন্ততঃ তাকে গোলাম হিসাবে কোথাও বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু হযরত ওমর (রাঃ) বিশেষ কর দেওয়ার ওয়াদায় হরমুযানকে ছেড়ে দিলেন।

হরমুযান নিজ রাজ্যে ফিরে ওয়াদার কথা ভুলে গেলেন। অনেক টাকা-পয়সা ও বিরাটসৈন্য সমাবেশ নিয়ে তিনি আবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করলেন। তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো ।অবশেষে হনমুযান পরাজিত হয়ে আবার মুসলমানদের হাতে বন্দী হলেন।তাকে হযরত ওমর (রাঃ) এর দরবারে হাজির করা হলে খলিফা জিজ্ঞেস করলেন,

আপনিই কি কুখ্যাত নিহাওয়ান্দ শাসনকর্তা হরমুযান?

হ্যাঁ খলিফা , আমিই নিহাওয়ান্দ এর অধিপতি হরমুযান।

আপনিই বার বার আরবের মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করেছেন এবং বার বার অন্যায় যুদ্ধের কারন ঘটিয়েছেন?

এ কথা সত্যি যে, আমি আপনার অধীনতা স্বীকার করতে রাজী হইনি, তাই বার বার যুদ্ধ করতে হয়েছে।

কিন্তু এ কথা কি মিথ্যে যে, আপনাকে পরাজিত ও বন্দী করার পরও আপনারপ্রস্তাবানুসারে সোলেহনামার শর্ত মতে আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বার বার আপনি সোলেহনামার শর্ত ভংগ করেছেন এবং অন্যায় যুদ্ধে মুসলমানদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন?

এ কথা মিথ্যা নয়।

আপনি কি জানেন আপনার কি সাজা হবে?

জানি, আমার সাজা মুত্যু এবং আমি সেজন্য প্রস্তত আছি।

এবং এই মুহুর্তেই?

তাও বেশ জানি।

তা হলে আপনার যদি কোন শেষ বাসনা থাকে তা প্রকাশ করতে পারেন।

খলিফা, মৃত্যুর আগে আমি শুধুই এক বাটি পানি খাব।

খলিফার হুকুমে বাটিতে পানি এল। হরমুযানের হাতে দেওয়া হলে খলিফা

বললেন,

আপনি সাধ মিটিয়ে পানি খেয়ে নিন।

আমার শুধুই ভয় হয় পানি খাওয়ার সময়ই জল্লাদ না এক কোপে আমার

মাথাটা দেহ থেকে আলাদা না করে দেয়।

না হরমুযান, আপনার কোনই ভয় নেই। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, এই পানি খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ আপনাকে কতল করবে না ।

খলিফা, আপনি বলেছেন এই পানি পান করা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ আমায় কতল করবে না। ( বাটির পানি মাটিতে ফেলে দিয়ে) সত্যি ?

এ পানি আর আমি খাচ্ছি না এবং তাই আপনার কথা মত কেউই আমাকে আর কতল করতে পারবে না।

চমৎকৃত হযরত ওমর (রাঃ) খানিক চুপ করে থেকে হেসে ফেললেন।

বললেন, হরমুযান: আপনি সত্যিই একটি নয়া উপায় বের করেছেন নিজেকে রক্ষা করার জন্যে। কিন্তু ওমরও যে আপনাকে কথা দিয়েছে তার খেলাপ হবে না। আপনি আযাদ, আপনি নির্ভয়ে নিজ রাজ্যে চলে যান।

হরমুযান চলে গেলেন। অল্পদিন পরে বহু সংখ্যক লোক নিয়ে আবার এলেন।খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর দরবারে হাজির হয়ে বললেন,

আমিরুল মু’মিনিন! হরমুযান আবার এসেছে। এবার সে এসেছে বিদ্রোহীর বেশে নয়, এক নব জীবনের সন্ধানে। আপনি তাকে তার অনুচরবর্গসহ ইসলামে দীক্ষিত করুন। হরমুযান আর বলতে পারলেন না। তার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো।

হযরত ওমর (রাঃ) দেখলেন, লৌহমানব হরমুযানের দু’চোখ পানিতে হলহল করছে । হরমুযানকে তিনি আলিংগন করলেন।

         ওমর (রাঃ)-এর একটি ভাষণঃ

ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ওমর ফারূক (রাঃ) জীবনের শেষ হজ্জ সমাপনের পর মসজিদে নববীতে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত হাদীছ।–

ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মুহাজিরদের কতক লোককে পড়াতাম। তাদের মধ্যে আব্দুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ) ছিলেন অন্যতম। একবার আমি তার মিনার বাড়িতে ছিলাম। তখন তিনি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ)-এর সঙ্গে হজ্জে ছিলেন। এমন সময় আব্দুর রহমান (রাঃ) আমার কাছে ফিরে এসে বললেন, যদি আপনি ঐ লোকটিকে দেখতেন, যে লোকটি আজ আমীরুল মুমিনীন-এর কাছে এসেছিল এবং বলেছিল, হে আমীরুল মুমিনীন! অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার কিছু করার আছে কি? যে লোকটি বলে থাকে যে, যদি ওমর মারা যান তাহ’লে অবশ্যই অমুকের হাতে বায়‘আত করব। আল্লাহ্র কসম! আবূবকরের বায়‘আত আকস্মিক ব্যাপারই ছিল। ফলে তা হয়ে যায়। এ কথা শুনে তিনি ভীষণভাবে রাগান্বিত হ’লেন। তারপর বললেন, ইনশাআল্লাহ সন্ধ্যায় আমি অবশ্যই লোকদের মধ্যে দাঁড়াব আর তাদেরকে ঐসব লোক থেকে সতর্ক করে দিব, যারা তাদের বিষয়াদি আত্মসাৎ করতে চায়।

আব্দুর রহমান (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি এমনটা করবেন না। কারণ হজ্জের মওসুম নিম্নস্তরের ও নির্বোধ লোকদেরকে একত্রিত করে। আর এরাই আপনার নৈকট্যের সুযোগে প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলবে, যখন আপনি লোকদের মধ্যে দাঁড়াবেন। আমার ভয় হচ্ছে, আপনি যখন দাঁড়িয়ে কোন কথা বলবেন, তখন তা সব জায়গায় তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়বে। আর তারা তা ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারবে না। আর সঠিক রাখতেও পারবে না। সুতরাং মদীনায় পৌঁছা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। আর তা হ’ল হিজরত ও সুন্নাতের কেন্দ্রস্থল। ফলে সেখানে জ্ঞানী ও সুধীবর্গের সঙ্গে মিলিত হবেন। আর যা বলার তা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারবেন। জ্ঞানী ব্যক্তিরা আপনার কথাকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবে ও সঠিক ব্যবহার করবে। তখন ওমর (রাঃ) বললেন, জেনে রেখো! আল্লাহ্র কসম! ইনশাআল্লাহ আমি মদীনায় পৌঁছার পর সর্বপ্রথম এ কাজটি নিয়ে ভাষণের জন্য দাঁড়াব।

ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমরা যিলহজ্জ মাসের শেষ দিকে মদীনায় ফিরলাম। যখন জুম‘আর দিন এল, সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি মসজিদে গেলাম। পৌঁছে দেখি, সাঈদ ইবনু যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল (রাঃ) মিম্বরের গোড়ায় বসে আছেন, আমিও তার পাশে এমনভাবে বসলাম যেন আমার হাঁটু তার হাঁটু স্পর্শ করছে। অল্পক্ষণের মধ্যে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাঃ) বেরিয়ে আসলেন। আমি যখন তাঁকে সামনের দিকে আসতে দেখলাম, তখন সাঈদ ইবনু যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েলকে বললাম, আজ সন্ধ্যায় অবশ্যই তিনি এমন কিছু কথা বলবেন, যা তিনি খলীফা হওয়া থেকে আজ পর্যন্ত বলেননি। কিন্তু তিনি আমার কথাটি উড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, আমার মনে হয় না যে, তিনি এমন কোন কথা বলবেন, যা এর আগে বলেননি। এরপর ওমর (রাঃ) মিম্বরের উপরে বসলেন। যখন মুয়াযযিন আযান থেকে ফারেগ হয়ে গেলেন তখন তিনি দাঁড়ালেন। আর আল্লাহ্র যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, ‘আম্মাবা‘দ। আজ আমি তোমাদেরকে এমন কথা বলতে চাই, যা আমারই বলা কর্তব্য। হয়তবা কথাটি আমার মৃত্যুর নিকটবর্তী সময়ে হচ্ছে। তাই যে ব্যক্তি কথাগুলো ঠিকভাবে বুঝে সংরক্ষণ করবে সে যেন কথাগুলো ঐসব স্থানে পৌঁছে দেয় যেখানে তার সওয়ারী পৌঁছবে। আর যে ব্যক্তি কথাগুলো ঠিকভাবে বুঝতে আশংকাবোধ করছে আমি তার জন্য আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করা ঠিক মনে করছি না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। আর তাঁর উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং আল্লাহ্র অবতীর্ণ বিষয়াদির একটি ছিল রজমের আয়াত। আমরা সে আয়াত পড়েছি, বুঝেছি, আয়ত্ত করেছি।

আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ) পাথর মেরে হত্যা করেছেন। আমরাও তাঁর পরে পাথর মেরে হত্যা করেছি। আমি আশংকা করছি যে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হবার পর কোন লোক এ কথা বলে ফেলতে পারে যে, আল্লাহ্র কসম! আমরা আল্লাহ্র কিতাবে পাথর মেরে হত্যার আয়াত পাচ্ছি না। ফলে তারা এমন একটি ফরয ত্যাগের কারণে পথভ্রষ্ট হবে, যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ্র কিতাব অনুযায়ী ঐ ব্যক্তির উপর পাথর মেরে হত্যা অবধারিত, যে বিবাহিত হবার পর যেনা করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী। যখন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে অথবা গর্ভ বা স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে। তেমনি আমরা আল্লাহ্র কিতাবে এও পড়তাম যে, তোমরা তোমাদের বাপ-দাদা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। এটি তোমাদের জন্য কুফরী যে, তোমরা স্বীয় বাপ-দাদা থেকে বিমুখ হবে। জেনে রেখো! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমরা সীমা ছাড়িয়ে আমার প্রশংসা করো না, যেভাবে ঈসা ইবনু মারিয়ামের সীমা ছাড়িয়ে প্রশংসা করা হয়েছে। তোমরা বল, আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল। এরপর আমার কাছে এ কথা পৌঁছেছে যে, তোমাদের কেউ এ কথা বলছে যে, আল্লাহ্র কসম! যদি ওমর মারা যায় তাহ’লে আমি অমুকের হাতে বায়‘আত করব। কেউ যেন এ কথা বলে ধোঁকায় না পড়ে যে আবূবকরের বায়‘আত ছিল আকস্মিক ঘটনা। ফলে তা সংঘটিত হয়ে যায়। জেনে রেখো! তা অবশ্যই এমন ছিল। তবে আল্লাহ আকস্মিক বায়‘আতের ক্ষতি প্রতিহত করেছেন। সফর করে সওয়ারীগুলোর ঘাড় ভেঙ্গে যায়- এমন স্থান পর্যন্ত মানুষের মাঝে আবূবকরের মত কে আছে? যে কেউ মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কোন লোকের হাতে বায়‘আত করবে, তার অনুসরণ করা যাবে না এবং ঐ লোকেরও না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা উভয়েরই হত্যার শিকার হবার আশংকা রয়েছে। যখন আল্লাহ তাঁর নবী (ছাঃ)-কে ওফাত দিলেন, তখন আবূবকর (রাঃ) ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। অবশ্য আনছারগণ আমাদের বিরোধিতা করেছেন। তারা সকলে বাণী সা‘ঈদার চত্বরে মিলিত হয়েছেন। আমাদের থেকে বিমুখ হয়ে আলী, যুবায়ের ও তাঁদের সাথীরাও বিরোধিতা করেছেন। অপরদিকে মুহাজিরগণ আবূবকরের কাছে সমবেত হ’লেন। তখন আমি আবূবকরকে বললাম, হে আবূবকর! আমাদেরকে নিয়ে আমাদের ঐ আনছার ভাইদের কাছে চলুন। আমরা তাদের উদ্দেশ্যে রওনা হ’লাম। যখন আমরা তাদের নিকটবর্তী হ’লাম তখন আমাদের সঙ্গে তাদের দু’জন পুণ্যবান ব্যক্তির সাক্ষাৎ হ’ল। তারা উভয়েই এ বিষয়ে আলোচনা করলেন, যে বিষয়ে লোকেরা ঐকমত্য হয়েছিল। এরপর তারা বললেন, হে মুহাজির দল! আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? তখন আমরা বললাম, আমরা আমাদের ঐ আনছার ভাইদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি। তারা বললেন, না, আপনাদের তাদের নিকট না যাওয়াই উচিত। আপনারা আপনাদের বিষয় সমাপ্ত করে নিন। তখন আমি বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমরা অবশ্যই তাদের কাছে যাব। আমরা চললাম। অবশেষে বাণী সা‘ঈদার চত্বরে তাদের কাছে আসলাম। আমরা দেখতে পেলাম তাদের মাঝখানে এক লোক বস্ত্রাবৃত অবস্থায় রয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঐ লোক কে? তারা জবাব দিল ইনি সা‘দ ইবনু ওবাদাহ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার কী হয়েছে? তারা বলল, তিনি জ্বরে আক্রান্ত। আমরা কিছুক্ষণ বসার পরই তাদের খত্বীব উঠে দাঁড়িয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পড়লেন এবং আল্লাহ্র যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, আম্মাবা‘দ। আমরা আল্লাহ্র (দ্বীনের) সাহায্যকারী ও ইসলামের সেনাদল এবং তোমরা হে মুহাজির দল! একটি ছোট দল মাত্র, যে দলটি তোমাদের গোত্র থেকে আলাদা হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। অথচ এরা এখন আমাদেরকে মূল থেকে সরিয়ে দিতে এবং খিলাফত থেকে বঞ্চিত করে দিতে চাচ্ছে। যখন তিনি নিশ্চুপ হ’লেন তখন আমি কিছু বলার ইচ্ছা করলাম। আর আমি আগে থেকেই কিছু কথা সাজিয়ে রেখেছিলাম, যা আমার কাছে ভাল লাগছিল। আমি ইচ্ছা করলাম যে, আবূবকর (রাঃ)-এর সামনে কথাটি পেশ করব। আমি তাঁর ভাষণ থেকে সৃষ্ট রাগকে কিছুটা ঠান্ডা করতে চাইলাম। আমি যখন কথা বলতে চাইলাম তখন আবূবকর (রাঃ) বললেন, তুমি থাম। আমি তাঁকে রাগান্বিত করাটা পসন্দ করলাম না। তাই আবূবকর (রাঃ) কথা বললেন, আর তিনি ছিলেন আমার চেয়ে সহনশীল ও গম্ভীর। আল্লাহ্র কসম! তিনি এমন কোন কথা বাদ দেননি যা আমি সাজিয়ে রেখেছিলাম। অথচ তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঐরকম বরং তার থেকেও উত্তম কথা বললেন। অবশেষে তিনি কথা বন্ধ করে দিলেন।

এরপর আবার বললেন, তোমরা তোমাদের ব্যাপারে যেসব উত্তম কাজের কথা বলেছ আসলে তোমরা এর উপযুক্ত। তবে খিলাফতের ব্যাপারটি কেবল এই কুরাইশ বংশের জন্য নির্দিষ্ট। তারা হচ্ছে বংশ ও আবাসভূমির দিক দিয়ে সর্বোত্তম আরব। আর আমি এ দু’জন হ’তে যে কোন একজনকে তোমাদের জন্য নির্ধারিত করলাম। তোমরা যে কোন একজনের হাতে ইচ্ছা বায়‘আত করে নাও। এরপর তিনি আমার ও আবূ ওবায়দাহ ইবনুল জাররাহ (রাঃ)-এর হাত ধরলেন। তিনি আমাদের মাঝখানেই বসা ছিলেন। আমি তাঁর এ কথা ব্যতীত যত কথা বলেছেন কোনটাকে অপসন্দ করিনি। আল্লাহ্র কসম! আবূবকর যে জাতির মধ্যে বর্তমান আছেন সে জাতির উপর আমি শাসক নিযুক্ত হবার চেয়ে এটাই শ্রেয় যে, আমাকে পেশ করে আমার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়া হবে, ফলে তা আমাকে কোন গুনাহের কাছে আর নিয়ে যেতে পারবে না। হে আল্লাহ! হয়ত আমার আত্মা আমার মৃত্যুর সময় এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা করতে পারে, যা এখন আমি পাচ্ছি না। তখন আনছারদের এক ব্যক্তি বলে উঠল, আমি এ জাতির অভিজ্ঞ ও বংশগত সম্ভ্রান্ত। হে কুরাইশগণ! আমাদের হ’তে হবে এক আমীর আর তোমাদের হ’তে হবে এক আমীর। এ সময় অনেক কথা ও হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। আমি এ মতবিরোধের দরুন শংকিত হয়ে পড়লাম। তাই আমি বললাম, হে আবূবকর! আপনি হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালেন। আমি তাঁর হাতে বায়‘আত করলাম। মুহাজিরগণও তাঁর হাতে বায়‘আত করলেন। অতঃপর আনছারগণও তাঁর হাতে বায়‘আত করলেন। আর আমরা সা‘দ ইবনু ওবাদাহ (রাঃ)-এর দিকে অগ্রসর হ’লাম। তখন তাদের এক লোক বলে উঠল, তোমরা সা‘দ ইবনু ওবাদাকে জানে মেরে ফেলেছ। তখন আমি বললাম, আল্লাহ সা‘দ ইবনু ওবাদাকে হত্যা করেছেন। ওমর (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্র কসম! আমরা সে সময়ের যরূরী বিষয়ের মধ্যে আবূবকরের বায়‘আতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুকে মনে করিনি। আমাদের ভয় ছিল যে, যদি বায়‘আতের কাজ অসম্পন্ন থাকে, আর এ জাতি থেকে আলাদা হয়ে যাই তাহ’লে তারা আমাদের পরে তাদের কারো হাতে বায়‘আত করে নিতে পারে। তারপর হয়ত আমাদেরকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের অনুসরণ করতে হ’ত, না হয় তাদের বিরোধিতা করতে হ’ত। ফলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াত। অতএব যে ব্যক্তি মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কোন ব্যক্তির হাতে বায়‘আত করবে তার অনুসরণ করা যাবে না। আর ঐ লোকেরও না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা উভয়েরই নিহত হওয়ার আশংকা আছে (বুখারী হা/৬৮৩০ ‘দন্ডবিধি’ অধ্যায়)।

এ হাদীছে আবূবকর (রাঃ)-এর বায়‘আত গ্রহণের পূর্বের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। আর এ বায়‘আত গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনছার ও মুহাজিরদের মাঝে বিবদমান বাকবিতন্ডার অবসান ঘটে। এ হাদীছে একে অপরকে মেনে নেওয়ার যে দৃষ্টান্ত বিধৃত হয়েছে, তা থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

              ভয়াবহতা !

আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, আরবরা সফরে গেলে একে অপরের খিদমত করত। আবুবকর ও ওমর (রাঃ)-এর সাথে একজন লোক ছিল যে তাদের খিদমত করত। তারা ঘুমিয়ে পড়লেন। অতঃপর জাগ্রত হলে লক্ষ করলেন যে, সে তাদের জন্য খাবার প্রস্ত্তত করেনি (বরং ঘুমিয়ে আছে)। ফলে একজন তার অপর সাথীকে বললেন, এতো তোমাদের নবী (ছাঃ)-এর ন্যায় ঘুমায়। অন্য বর্ণনায় আছে তোমাদের বাড়িতে ঘুমানোর ন্যায় ঘুমায় (অর্থাৎ অধিক ঘুমায় এমন ব্যক্তি)।

অতঃপর তারা তাকে জাগিয়ে বললেন, তুমি রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট গমন করে তাঁকে বল যে, আবুবকর ও ওমর (রাঃ) আপনাকে সালাম প্রদান করেছেন এবং আপনার নিকট তরকারী চেয়েছেন। রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, যাও, তাদেরকে আমার সালাম প্রদান করে বলবে যে, তারা তরকারী খেয়ে নিয়েছে। (একথা শুনে) তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট গমন করে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছাঃ)! আমরা আপনার নিকট তরকারী চাইতে ওকে পাঠালাম। অথচ আপনি তাকে বলেছেন যে তারা তরকারী খেয়েছে। আমরা কি তরকারী খেয়েছি? তিনি (ছাঃ) বললেন, তোমাদের ভাইয়ের গোস্ত দিয়ে। যার হাতে আমার প্রাণ তার কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের উভয়ের দাঁতের মধ্যে তার গোস্ত দেখতে পাচ্ছি। তারা বললেন, আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি (ছাঃ) বললেন, না বরং সেই তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে’ (সিলসিলা ছহীহাহ হা/২৬০৮)।

আয়েশা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বললাম, ‘আপনার জন্য ছাফিয়ার এই এই হওয়া যথেষ্ট’। কোন কোন বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ছাফিয়া বেঁটে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ‘তুমি এমন কথা বললে, যদি তা সমুদ্রের পানিতে মিশানো হয়, তাহ’লে তার স্বাদ পরিবর্তন করে দেবে’।

আয়েশা (রাঃ) বলেন, একদা রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট একটি লোকের পরিহাসমূলক ভঙ্গি করলাম। তিনি বললেন, ‘কোন ব্যক্তির পরিহাসমূলক ভঙ্গি নকল করি আর তার বিনিময়ে এত এত পরিমাণ ধনপ্রাপ্ত হই, এটা আমি আদৌ পসন্দ করি ন’ (আবুদাউদ হা/৪৮৭৭, সনদ ছহীহ)।

কায়স বলেন, আমর ইবনুল আছ (রাঃ) তার কতিপয় সঙ্গী-সাথীসহ ভ্রমণ করছিলেন। তিনি একটি মৃত খচ্চরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, যা ফুলে উঠেছিল। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! কোন ব্যক্তি যদি পেট পুরেও এটা খায়, তবুও তা কোন মুসলমানের গোশত খাওয়ার চেয়ে উত্তম’ (আদাবুল মুফরাদ হা/৭৩৬, সনদ ছহীহ)।দূর সাগরের ডাক ।খলিফা হযরত উমর (রা)।খলিফা হবার আগেও তিনি গরিব-দুঃখীদের খোঁজ খবর নিতেন। তাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন।

গরিব-দুঃখীদের খবর নেবার জন্যে তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য হযরত উমর (রা) রাতের গভীর মহল্লায়-মহল্লায় ঘুড়ে বেড়াতেন। একাকী। ঘুরতে ঘুরতে একবার তিনি মদীনার একপ্রান্তে এস পৌঁছুলেন।সেই এলাকার একপাশে থাকেন এক অসহায় বুড়ি। দারুণ দুঃখ-কষ্টে বুড়ির দিন কাটে।

হযরত উমর (রা) বুড়ির দুঃখের কথা জেনে বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাকে সাহায্য করার জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাবলেন, নিজের হাতেই তাকে সাহায্য করবেন।পরদিন হযরত উমর (রা) একাকী চলে গেলেন বুড়ির বাড়িতে।

বুড়ির সাথে দেখা করলেন।শুনলেন, কে একজন এসে তার কষ্ট দূর করে দিয়ে গেছেন।অবাক হলেন হযরত উমর (রা)।বড় আশর্যের কথঅ! কে সেই ব্যক্তি, যিনি উমরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চান? সে কোন ব্যক্তি, যিনি মানুষের সেবায় উমরকে পরাজিত করেন!তাকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে পড়লেন হযরত উমর (রা)।যে করেই হোক, তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।– ভাবলেন তিনি।প্রতিদিন তিনি লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। চেষ্টা করেন সেই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে। এভাবে কেটে যায় সময়। কেটে যায় প্রহর। কিন্তু পান না তার প্রার্থিত সেই ব্যক্তিকে।

আর কত অপেক্ষা করতে হবে? তিনি ভাবেন।এক রাতে লুকিয়ে আছেন হযরত ওমর (রা)।একটু পরেই তিনি দেখলেন, একজন ব্যক্তি এলেন বুড়ির বাড়িতে।বুড়ির কাছে গিয়ে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।বুড়ি খুশি হলেন।খুব ভালোকরে তাকিয়ে দেখলেন হযরত উমর (রা)।দেখলেন, যিনি বুড়ির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তিনি আর কেউ নন- হযরত আবু বকর (রা)।দুই প্রতিদ্বন্দীর মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলে দু’জনই হেসে উঠলেন। সে এক মধুর হাসি।উমর (রা) বললেন, আল্লাহর দরবারে হাজার শোকর যে, স্বয়ং খলিফা ছাড়া আমি আর কারো কাছে পরাজিত হইনি।এই হলেন প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা)।হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন রাসূলের (সা) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম। জ্ঞানে-পজ্ঞায় বিদ্যা-বুদ্ধিতে তিনি ছিলেন অসাধারণ।হযরত আবু বকর ছিলেন অত্যন্ত দয়ালূ এবং সহনশীল।নম্রতা, ভদ্রতা এবং বিনয় ছিল তার একান্ত ভূষণ।

ইসলামপূর্ব সময়ে সেই জাহেলি যুগেও হযরত আবু বকর ছিলেন চরিত্র, ব্যবহার আর আচরণগত দিক থেকে অনুকরণীয়।জাহেলী সমাজের কোনো কালিমাই তাক কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।এ কারণে মক্কাবাসীরা তাকে শ্রদ্ধা করতো একান্ত হৃদয় থেকে।আর বিশ্বাস করতো তাকে সর্বান্তকরণে। কুরাইশদের মধ্যে তার মর্যাদা ছিল অনেক উচ্চে।খুব ছোটকাল থেকে, সেই শৈশবকাল থেকেই আবু বকরের (রা) বন্ধুত্ব এবং গভীর সম্পর্ক ছিল রাসূলের (সা) সাথে।বয়সের দিক থেকেও তারা ছিলেন প্রায় সমবয়সী। এক সাথে, একই পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছিলেন দু’জন। ব্যবসা, বাণিজ্যেও যেতেন একই সাথে।একবার ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া যাচ্ছেন রাসুল (সা)।তখন তাঁর বয়স বিশ বছর।

আর তাঁর সাথে বন্ধু আবু বকর। তার বয়স তখন আঠার।সিরিয়া সীমান্তে পৌঁছে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।একটি গাছের নিচে বসে পড়লেন রাসুল (সা)।তাঁর থেকে একটু দূরে গিয়ে এদিকে-ওদিক তাকিয়ে দেখছেন আবু বকর (রা)।এমনি সময়ে তিনি দেখতে পেলেন একজন পাদ্রিকে। খ্রিস্টান পাদ্রির নাম- ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’।

পাদ্রির সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো আবু বকরের। না, অন্য কোনো প্রসঙ্গে নয়। তাদের আলাপ ছিল ধর্মীয় বিষয়েল মধ্যে সীমাবদ্ধ।আলাপের এক ফঁকে পাদ্রি জিজ্ঞেস করলেন, ঐখানে, ঐ গাছের নিচে বসে আছেন কে?আবু বকর জবাব দিলেন, উনি মক্কার কুরাইশ গোত্রের মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ!নামটি শুনেই পাদ্রি একটু থমকে গেলেন।তারপর বললেন, ঐ ব্যক্তি আরবের নবী হবেন।

পাদ্রির কথাটি শুনেই পাদ্রি একটু থমকে গেলেন।তারপর বললেন, ঐ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন।পাদ্রির কথাটি শুনেই আনন্দের এক অপার্থিব ঢেউ খেলে গেল আবু বকরের মধ্যে। তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো, হ্যাঁ- সত্যিই একদিন নবী হবেন আমার বন্ধু-মুহাম্মদ।পাদ্রির কথাটি মিথ্যা ছিল না।

এতটুকু ভুল ছিল না তার ধারণায়।সত্যিই একদিন আল্লাহর পক্ষথেকে নবুওয়াতের নিয়ামত হযরত মুহাম্মদ (সা)। নবুওয়াত প্রাপ্তির পর যখনই রাসুল (সা) ইসলামের দাওয়াত দিলেন আবু বকরকে, আর সাথে সাথে তিনি তা কবুল করলেন।রাসূলও (সা) বলতেন, ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি।’ হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন বয়স্ক আজাদ লোকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান। ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আবু বকর নিজেকে উৎসর্গ করে দেন আল্লাহর পথে।

রাসূলের (সা) প্রদর্শিত পথে।তাঁর যাবতীয় সম্পদ এবং শক্তি কুরবানী করে দেন আল্লাহর রাস্তায়। হাসিমুখে।দয়ার নবীজী (সা) যখন প্রকাশ্যে নবুওয়াতের ঘোষণা দিলেন, হযরত আবু বকরের কাছে তখন ছিল চল্লিশ হাজার দিরহাম।

মুহূর্তেই তিনি তার এই বিপুল অর্থ ওয়াক্‌ফ করে দিলেন ইসলামের জন্য। তার অর্থ দিয়েই দাসের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে ইসলামের খেদমতে নিজেদেরকে উৎসর্গ করার সুযোগ পেয়েছিল হযরত বিলাল, খাব্বা, আম্বার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব, আবু ফুকাইহাসহ আরও অনেক দাস-দাসী।

হযরত আবু বকরের দান সম্পর্কে রাসূল (সা) বলতেন:

‘আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি। কিন্তু আবু বকরের ইহসানসমূহ এমন যে, তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম। তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। তার অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্যকারো অর্থ তেমন আসেনি।’দয়ার নবীজীল মুখে মিরাজের কথা শুনে অনেকেই বিশ্বাস করতে দ্বিধান্বিত হন। কিন্তু আবু বকর তাহননি।

তিনি রাসূলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহর নবী! আপনি কি জনগণকে বলেছেন যে, আপনি গতরাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমণ করেছেন?’ রাসূল (সা) বললেন, হ্যাঁ। রাসূলের মুখ থেকে একথা শুনার সাথে সাথেই তিনি বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল।

About admin

Check Also

একজন মুসলিমের প্রতি অন্য মুসলিমের ছয়টি হক

ইসলামিক রিপোর্টারঃ মোঃ ফায়সাল আহমেদ ঢালী:  এক মুসলিম অন্য মুসলিমের প্রতি ৬টি হক রয়েছে। আর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *